১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক পটভুমি ও তাৎপর্য

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের

পলাশী বিপর্যয় থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনামলের সিংহভাগ ইংরেজি ছিল এদেশের রাষ্ট্রভাষা। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন জোরদার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা কী হবে সে সম্পর্কে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। ভারতবর্ষ স্বরাজ লাভ করলে স্বাধীন ভারতের সাধারণ ভাষা কী হবে এ নিয়ে প্রশ্ন করে মহাত্মা গান্ধী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে পত্র লিখলে জবাবে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন : ভারতের সাধারণ ভাষা তথা আশু-প্রাদেশিক যোগাযোগের একমাত্র ভাষা হতে পারে হিন্দি।

সর্বভারতীয় সাংস্কৃতিক পরিম-লে হিন্দুদের হিন্দি-প্রীতির বিষয়টিতে মুসলমানদের মধ্যে উর্দু ভাষার প্রতি একটা বিশেষ দুর্বলতা ছিল। এ ছাড়া গ্রামীণ ও আধুনিক ইসলামী শিক্ষার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দুই কেন্দ্র দেওবন্দ ও আলীগড় উভয়ের অবস্থান উর্দু-অধ্যুষিত অঞ্চলে হওয়ায় আমাদের দেশের প্রাচীন ও আধুনিকপন্থি অনেক শিক্ষিত পরিবারে উর্দু ভাষায় কথাবার্তা বলাকে আভিজাত্যের ব্যাপার মনে করতেন।
ব্রিটিশ শাসনামলে স্বাধীনতা আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটির নেতৃত্বে ছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, আরেকটির নেতৃত্বে ছিল নিখিল ভারত মুসলিম লীগ। কংগ্রেস ছিল অখ- ভারতের সমর্থক। অপরদিকে মুসলিম লীগ ১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেশনে এক প্রস্তাবে ভারতবর্ষ হিন্দু-প্রধান ও মুসলমান প্রধান অঞ্চলে এমনভাবে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যার ফলে প্রতিটি ইউনিট এক একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। অনেক আলোচনা-সমালোচনার পর লীগ ও কংগ্রেস উভয় দলই ফর্মুলা মেনে নিতে সম্মত হয়।

এদিকে ১৯৪৬ সালে দিল্লিতে মুসলিম লীগ দলীয় আইন সভার সদস্যদের (লেজিসলেটারদের) কনভেনশনে লাহোর প্রস্তাবের আংশিক সংশোধন করে উপমহাদেশের মুসলিম আধুনিক পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলে নিয়ে একাধিকের বদলে আপাতত একটি (পাকিস্তান) রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব গৃহীত হয়। এ প্রস্তাবের উত্থাপক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তার প্রস্তাব উত্থাপনকালীন ভাষণের এক পর্যায়ে বলেন, অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেছেন : পাকিস্তানই আমার শেষ দাবি কি-না? আমি এ প্রশ্নের কোনো জবাব দেব না। তবে এ কথা আমি অবশ্যই বলব, এ মুহূর্তে পাকিস্তানই আমার প্রধান দাবি। 

অর্থাৎ তিনি লাহোর প্রস্তাবের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের মাধ্যমে উপমহাদেশের মুসলিম-অধ্যুষিত পূর্বাঞ্চলে একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নাকচ করে দিলেন না। যাই হোক দিল্লি প্রস্তাব মোতাবেক ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে এবং পূর্ববঙ্গকে এই বঙ্গের একটি প্রদেশ হিসেবে নিয়ে এই নতুন রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়।
এদিকে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে মুসলিম লীগের শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম কংগ্রেসের শরৎ চন্দ্র বসুর উদ্যোগে ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে একটি বৃহত্তর সার্বভৌম বাংলা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে চেষ্টা করেন তাতে মুসলিম লীগ নেতা কায়েদে আজম জিন্নাহর সমর্থন থাকলেও গান্ধী, নেহেরু, প্যাটেল প্রমুখ কংগ্রেস নেতা এবং হিন্দু মহান নেতা ড. শ্যামপ্রসাদ মুখার্জীর প্রবল বিরোধিতার কারণে সে উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এদের শেষোক্ত (শ্যামাপ্রসাদ) এখনও দাবি করেন ভারত ভাগ না হলেও বাংলা ভাগ হতেই হবে। নইলে হিন্দুরা অবিভক্ত বঙ্গদেশে স্থায়ী সংখ্যালঘু হয়ে যাবে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ-শাসিত ভারতবর্ষ অখ- অবয়বে স্বাধীনতা লাভ করতো। সেক্ষেত্রে হিন্দিভাষীদের বিপুল সংখ্যাধিক্যের কারণে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলাই সম্ভব হতো না। অন্যদিকে ১৯৪৭ সালে যদি লাহোর প্রস্তাবের পূর্ণ বাস্তবায়ন হতো, তা হলে পূর্বাঞ্চলীয় মুসলিম প্রধান রাষ্ট্রটির রাষ্ট্রভাষা হতো বাংলা। তাছাড়া যদি সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম ও শরৎচন্দ্র বসুর বৃহত্তর বাংলা রাষ্ট্র পরিকল্পনা হতো, তারও রাষ্ট্রভাষা বাংলা হতো। কিন্তু এসব না হয়েও যেভাবে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলো, তারও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলা হওয়ায় বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলা সহজ হয়।

১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর গঠিত সাংস্কৃতিক সংস্থা তমদ্দুন মজলিস ১৫ সেপ্টেম্বর তারিখে প্রকাশিত পাকিস্তানের ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু শীর্ষক পুস্তিকার মাধ্যমে এই ভাষা আন্দোলনের সূচনা করে। এখানে উল্লেখ্য, স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রভাষা যে হিন্দি হবে, সে সিদ্ধান্ত কংগ্রেস আগে-ভাগেই গ্রহণ করে। কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে সে সম্পর্কে মুসলিম লীগ কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব গ্রহণের আগেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. জিয়াউদ্দিন আহম্মদ এক বিবৃতিতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হওয়া উচিত বলে অভিমত প্রকাশ করলে বহু ভাষাবিদ ও প-িত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তার তীব্র প্রতিবাদ জানান। রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব গ্রহীত না হলেও নতুন রাষ্ট্রের প্রশাসনে অবাঙালি উচ্চপদস্থ আমলাদের আধিক্যের কারণে ভেতরে ভেতরে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্ত চলতে থাকে। এ চক্রান্ত ধরা পড়ে যায় নতুন রাষ্ট্রের পোস্ট কার্ড, মানি অর্ডার ফর্ম, এনভেলপ প্রভৃতিতে ইংরেজির সাথে শুধু উর্দুর ব্যবহার দেখে। এই চক্রান্তের কথা আঁচ করতে পেরেই তমদ্দুন মজলিশ ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না ‘উর্দু শীর্ষক পুস্তিকা লিখে ভাষা আন্দোলনের সূচনা করে।

শুধু পুস্তিকা প্রকাশ করেই তমদ্দুন মজলিশ বসে থাকেনি। এই দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে ব্যক্তি-সংযোগ, আলোচনা বৈঠক এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র-শিক্ষকের সভা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে। এসব কাজে প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবুুল কাসেম। ১৯৪৭ সালেই বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিজ্ঞানের শিক্ষক অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁইয়াকে আহ্বায়ক করে একটি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ফজলুল হক হলে ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সভা অনুষ্ঠিত হয়। এভাবে বাংলা ভাষার আন্দোলন চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্বতন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম ছাত্রলীগের একটি অংশ পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নামে একটি স্বতন্ত্র সংস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ সংস্থা ভাষা আন্দোলনের প্রশ্নে তমদ্দুন মজলিশের অবস্থান সমর্থন করে। তমদ্দুন মজলিশ ও ছাত্রলীগের যুগপত সদস্য শামসুল হককে আহ্বায়ক করে সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠিত হয়। এই সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। এই প্রতিবাদ দিবস বিপুল সাফল্যম-িত হয়। ১৯ মার্চ থেকে ১৪ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা শহরের সর্বত্র ভাষার দাবিতে বিক্ষোভ চলতে থাকে। তৎকালীন প্রাদেশিক চিফ মিনিস্টার খাজা নাজিমুদ্দিন এতে ভয় পেয়ে যান। কারণ, ১৯ মার্চ কায়েদে আজম জিন্নাহর ঢাকা সফরের কথা। খাজা নাজিমুদ্দিন পরিস্থিতি শান্ত করতে সকল দাবিদাওয়া মেনে নিয়ে সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এরপর জিন্নাহ ঢাকায় এসে রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় ও কার্জন হলের বিশেষ সমাবর্তনে ভাষণ দেন। উভয় ভাষণে তিনি উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। উভয় স্থানেই তার বক্তব্যের প্রতিবাদ হয়। বিশাল জনসভায় এ প্রতিবাদ তিনি টের না পেলেও সমাবর্তনের সীমিত উপস্থিতিতে কিছু তরুণ যখন ভাষা সম্পর্কে তার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানায়, তিনি চিন্তিত হয়ে থমকে যান এবং বক্তব্য সমাপ্ত না করেই চলে যান। পরদিন তিনি বাংলা ভাষা সমর্থকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। উভয় পক্ষ নিজ নিজ বক্তব্যে অটল থাকায় বৈঠক ব্যর্থ হয়ে যায়। তবে ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত জিন্নাহ সাহেব রাষ্ট্রভাষা নিয়ে আর কোনো বক্তব্য দেননি।

১৯৪৮ থেকে ১৯৫১ পর্যন্ত রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে কোনো বড় ঘটনা ঘটেনি। ১৯৪৯ সালে বাংলা হরফ বদলানোর এক চক্রান্ত হলে তমদ্দুন মজলিশসহ বিভিন্ন সংস্থা প্রতিবাদ জানালে সরকার এ প্রশ্নে পিঠটান দিতে বাধ্য হয়। এরপর ১৯৫২ সালে খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ঢাকায় এসে ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে এক জনসভায় ঘোষণা দেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। যে নাজিমুদ্দিন ১৯৪৮ সালে বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবি মেনে নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেন তার এ ঘোষণা বিশ্বাসঘাতকতা বলে সবার কাছে প্রতিভাত হয়। ওই বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিবাদেই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়।

এর পরের ইতিহাস সবার জানা। তবে ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তরুণদের রক্তদানের পর বাংলা রাষ্ট্র ভাষার বিরুদ্ধে কেউ আর কখনও চক্রান্ত করার সাহস পায়নি এবং ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এভাবেই ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত বিজয় গৃহীত হয়।


১৯৪৭ সালে তমদ্দুন মজলিশের প্রকাশিত ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু শীর্ষক পুস্তিকায় লাহোর প্রস্তাবের যে উল্লেখ ছিল সে প্রস্তাবের সুদূরপ্রসারি লক্ষ্য হিসেবে উপমহাদেশের মুসলিম-অধ্যুষিত পূর্বাঞ্চলে একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা ছিল, নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে সে লক্ষ্যও অর্জিত হয়েছে ১৯৭১ সালে। সে নিরিখে বলা যায় ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত ফসল হিসাবেই আজ আমরা বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্রের গর্বিত নাগরিক।

==অধ্যাপক আবদুল গফুর

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য ও ইতিহাস

১৯৪৭ সালের ১৪/১৫ আগস্ট ইংরেজ মস্তিষ্কপ্রসূত দ্বিজাতিতত্বের ভিত্তিতে দ্বিখন্ডিত হয় ভারতবর্ষ জন্ম নেয় ভারত  কিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র পাকিস্তানের আবার দুটি অংশ- পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তানজন্মলগ্ন থেকেই বাঙালিপ্রধান পূর্ব পাকিস্তানের শোষক, নির্যাতক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে পশ্চিম পাকিস্তান হাজার বছর ধরেই ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলীয় বঙ্গভূমির জনগণের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও

১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ভাষণকালে কায়েদে আজম মোহম্মদ আলি জিন্নাহ ঘোষণা করলেন, “উর্দু, এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষাতার ঘোষণায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে গোটা বাংলা

তৎকালীন বহুভাষিক রাষ্ট্র পাকিস্তানে বিভিন্ন অঞ্চলে মাতৃভাষাভিত্তিক পরিসংখ্যানমতে,

1.            বাংলায় কথা বলে প্রায় ৫৪% জন
2.            পাঞ্জাবিতে প্রায় ২৭% জন
3.            উর্দুতে প্রায় % জন
4.            পশতুতে প্রায় % জন
5.            হিন্দিতে প্রায় % জন
6.            ইংরেজিতে প্রায় % জন

গণ-আজাদী লীগ : ভাষার দাবীতে সোচ্চার

১৯৪৭ সালে জুন মাসের শেষ দিকে ঢাকায় গঠিত হয় আদর্শভিত্তিক একটি ক্ষুদ্র সংগঠন : গণ-আজাদী লীগ [East Pakistan Peoples’ Freedom League] প্রতিষ্ঠাতা প্রধান আহ্বায়ক : কমরুদ্দীন আহমেদ
পরবর্তীতে যোগ দেন প্রখ্যাত বামপন্হী নেতা তাজউদ্দীন আহমেদ, মোহম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ প্রমুখ তাদের মূল লক্ষ্য ছিল মুসলিম লীগের অন্যতম নেতা, নামে বাঙালি কার্যত বাঙালির শত্রু খাজা নাজিমউদ্দীনের যাবতীয় প্রতিক্রিয়াশীল রাজনতিক কর্মকান্ড প্রতিরোধ করা ভাষার দাবীতে গণ-আজাদী লীগের মেনিফেস্টোতে বলা হয়-
মাতৃভাষার সাহায্যে শিক্ষাদান করিতে হইবে
বাংলা আমাদের মাতৃভাষা এই ভাষাকে দেশের যথোপযোগী করিবার জন্য সর্বপ্রকার ব্যবস্হা করিতে হইবে বাংলা হইবে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা

তমদ্দুন মজলিস : ভাষার দাবীতে ঐক্যবদ্ধ

১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর জন্মলাভ করে সাংস্কৃতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিস এটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান, অধ্যাপক ছাত্রদের সম্মিলিত উদ্যোগের ফসল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম ছিলেন এর প্রধান
১৫ সেপ্টেম্বর তারা একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন- ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা- বাংলা না উর্দু?’ এখানে ভাষা বিষয়ক একটি প্রস্তাব করা হয়-
.বাংলা ভাষাই হবে
. পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন
. পূর্ব পাকিস্তানের আদালতের ভাষা
. পূর্ব পাকিস্তানের অফিসাদির ভাষা
.পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের রাষ্ট্রভাষা হবে দুটি- বাংলা উর্দু
.. বাংলাই হবে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষাবিভাগের প্রথম ভাষা পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা একশ জনই ভাষা শিক্ষা করবেন
. পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু হবে দ্বিতীয় ভাষা বা আন্তঃপ্রাদেশিক ভাষা যারা পাকিস্তানের অন্যান্য অংশে চাকুরি ইত্যাদি কাজে নিযুক্ত হবেন, তারাই শুধু ভাষা শিক্ষা করবেন ইহা পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা হইতে ১০ জন শিক্ষা করলেও চলবে মাধ্যমিক স্কুলের উচ্চতর শ্রেণীতে এই ভাষাকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে শিক্ষা দেওয়া হবে
. ইংরেজি হবে পাকিস্তানের তৃতীয় ভাষা বা আন্তর্জাতিক ভাষা পাকিস্তানের কর্মচারী হিসেবে যারা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে চাকুরি করবেন বা যারা উচ্চতর বিজ্ঞান শিক্ষায় নিয়োজিত হবেন তারাই শুধু ইংরেজি ভাষা শিক্ষা করবেন তাদের সংখ্যা পূর্ব পাকিস্তানে হাজারকরা জনের বেশি কখনো হবে না ঠিক একই নীতি হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলিতে ওখানের (স্হানীয় ভাষার দাবী না উঠলে) উর্দু হবে প্রথম ভাষা, বাংলা দ্বিতীয় ভাষা আর ইংরেজি তৃতীয় ভাষার স্হান অধিকার করবে
.শাসনকাজ বিজ্ঞান শিক্ষার সুবিধার জন্য আপাততঃ ইংরেজি বাংলা উভয় ভাষাতেই পূর্ব পাকিস্তানের শাসনকাজ চলবে ইতোমধ্যে প্রয়োজনানুযায়ী বাংলা ভাষার সংস্কার করতে হবে দেশের শক্তির যাতে অপচয় না হয় এবং যে ভাষায় দেশের জনগণ সহজে অল্প সময়ে লিখতে, শিখতে বলতে পারে, সে ভাষাই হবে রাষ্ট্রভাষা এই অকাট্য যুক্তিই উপরোক্ত প্রস্তাবের প্রধান ভিত্তি না হলে ইংজে সাম্রাজ্যবাদ যেমন জনগণের মত না নিয়ে বা তাদের অসুবিধার দিকে না লক্ষ্য রেখে ইংরেজিকে জোর করে আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল- শুধু কিংবা বাংলাকে সমস্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করলে ঠিক সেই সাম্রাজ্যবাদী যৌক্তিক নীতিরই অনুসরণ করা হবে অথচ এই অবজ্ঞানিক অযৌক্তিক প্রচেষ্টাই আজ কোন কোন মহলে দেখা দিয়েছে ইহা সত্যিই বড় লজ্জাকর দুর্বল মনের অভিব্যক্তি একে সর্বপ্রকারে বাধা দিতে হবে এর বিরুদ্ধে বিরাট আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এরই সূচনা হিসেবে আমরা কয়েকজন লব্ধপ্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকের প্রবন্ধ প্রকাশ করছি এবং সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যেককে এই আন্দোলনে যোগ দেবার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি


১৯৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

ঊনসত্তরের গণ অভ্যুত্থান বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে ঊনসত্তরের জনগণের আন্দোলন যে কেবল ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছিল তাই- নয় এর মাধ্যমে আইয়ুব খানের শাসনামলে সাধিত উন্নয়ন সমৃদ্ধির যথার্থ রূপটিও পৃথিবীর সামনে উন্মোচিত হয়ে পড়ে ছাত্র অসন্তোষকে কেন্দ্র করে ১৯৬৮ সালের নভেম্বরে যে প্রাথমিক ঘটনাবলির সূত্রপাত তা পরবর্তীকালের কেবলমাত্র ছাত্র সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে পড়ে শ্রমিক-কৃষক ব্যাপক সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি নাগিরক দাবি-আইয়ূবের পতনকে কেন্দ্র করে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের দু অংশের মানুষ সময়ে একযোগে পথে নামে অভ্যুত্থানের পরিণতিতে শুধু আইয়ূব খানের পতন ঘটেনি বরং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয় 

১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ছিল আইয়ুব খানের শাসনামলে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী জঙ্গী আন্দোলন এটি শুরু হয়েছিল সরকারি নির্যাতনবিরোধী একটি সাধারণ লড়াই হিসেবে কিন্তু অচিরেই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের রূপ নিয়ে তা ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রামে গঞ্জে আন্দোলনের চরিত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে ব্যাপক গণজাগরণের মধ্য দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের তাৎপর্যও বৃদ্ধি পেয়েছে গণআন্দোলন সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গেলেই বলতে হয় ১১ দফার কথা 

কর্মসূচির ফলে ছাত্র সমাজ স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে এক প্রতিরোধ দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন ১১ দফা দফার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে দেশব্যাপী এক প্রচ- গণবিপ্লবের সৃষ্টি হয় গণ আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি লক্ষ্য করে ক্ষমতাসীন সরকার দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং তা প্রতিহত করতে পাক সরকার হত্যা নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে ফলে আন্দোলন আরো তীব্র জোরালো হতে থাকে এবং সমগ্র দেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে 

আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আইয়ূব খান মুজিবসহ সকল রাজবন্দিদের বিনাশর্তে মুক্তি প্রদান করেন তীব্র আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ত্যাগ করতে বাধ্য হন আন্দোলনের সুফল হিসেবে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিনিধি নির্বাচনের স্বীকৃতি মিলে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গ্রাম শহরাঞ্চলে শ্রেণি চেতনার উন্মেষ ঘটে এবং শ্রেণি সংগ্রামের আংশিক বিকাশ সাধিত হয় প্রকৃত পক্ষে আন্দোলনের ফলে সবচেয়ে বড় লাভ হলো স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে বাঙালিদের যে জাতীয়তাবোধ ১৯৪৮ এর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল তা পূর্ণতা লাভ করে আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বামপন্থীদের বৃহৎ অংশ এবং ডানপন্থী সংগঠনভুক্ত সদস্যদের মধ্যে পূর্ববাংলায় পৃথক রাষ্ট্র গঠনের আকাক্সক্ষা বৃদ্ধি পায় ছাত্রলীগের সভায় স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার প্রস্তাব গৃহীত হয় শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার চেতনা জনপ্রিয়তা লাভ করে যার ফলে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা ৃদ্ধি পায়

১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান জাতীয় চেতনার প্রতীক একুশে ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সময় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছিল।৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ২১ ফেব্রুয়ারিকে ছুটির দিন ঘোষণা করেছিল। কিন্তু৫৮ সালে সামরিক আইন জারির পর তা বাতিল হয়।৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের ফলস্বরূপ ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্বের মর্যাদা ফিরে পায়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পেছনে৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রভাব ছিল প্রত্যক্ষ এবং সক্রিয়। বাঙালিদের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এবং বাঙালি জাতির স্বাধিকার অর্জনের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সর্বদা অটল এবং প্রতিবাদমুখর।৬৯-এর গণআন্দোলন শেখ মুজিব সহ আওয়ামীলীগ নেতাদের মুক্তির পথ সুগম করেছিল। মুক্তিলাভের পর শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির স্বার্থ রক্ষায় সদা সজাগ সক্রিয় ছিলেন।

এর ফলে তার জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে।৬৯ এর গনঅভ্যুত্থানে সমাজতান্ত্রিক দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আর৭০-এর নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে শেখ মুজিবুর রহমান সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা আদর্শকে সংযুক্ত করায় বামপন্থীদের সমর্থন লাভ করেন। সর্বোপরি৬৯এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলায় যে জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠে।৭০-এর নিবাচনে তা পুরোপুরি আওয়ামী লীগের পক্ষে চলে যায়

লেখক : কলেজ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, মানবাধিকার কর্মী